রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে (৮) নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার পর লাশ খণ্ড-বিখণ্ড করে গুমের চেষ্টার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। মামলার উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আগামীকাল (শনিবার) রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হয় এবং বেলা ১১টা ৪৪ মিনিটে এজলাসে যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়ে দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে রায়ের তারিখ ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয়।
অভিযোগ নিরঙ্কুশ প্রমাণিত, আসামিদের মৃত্যুদণ্ড চাই
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক তথ্য, ডিএনএ রিপোর্ট, জব্দকৃত আলামত এবং ১৬ জন সাক্ষীর বক্তব্য বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, অপরাধটি আসামিদের বসবাস করা ফ্ল্যাটেই সংঘটিত হয়েছে এবং অ্যাভিডেন্স অ্যাক্টের ১০৬ ধারা অনুযায়ী ফ্ল্যাটের ভেতরে কী ঘটেছিল তার বিশেষ ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় আসামিদের ওপরই বর্তায়, যা তারা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষ জোর দিয়ে বলে:
মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ রিপোর্ট এবং আসামির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে অভিযোগ নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
সর্বোচ্চ শাস্তি: প্রধান আসামি সোহেল রানা পরিকল্পিতভাবে রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার পর মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে গুমের চেষ্টা করেন এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে এই জঘন্য অপরাধে সহযোগিতা করেন। তাই রাষ্ট্রপক্ষ উভয় আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে।
আসামি সোহেল রানা আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় হঠাৎ ‘ডলার’ নামের এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করায় রাষ্ট্রপক্ষ একে বিচার বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছে। বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু জানান, সোহেল রানা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বা তদন্তের কোথাও এই নামের উল্লেখ করেননি। জেলখানায় কোনো কুচক্রী মহলের পরামর্শে শেষ মুহূর্তে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও বিচার বিলম্বিত করতেই এই অবান্তর নাম আনা হয়েছে।
অপরাধ স্বীকার করেছে, ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন দিন
দেশজুড়ে আলোচিত এই মামলার কারণে ঢাকা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য আসামিপক্ষে দাঁড়াননি। ফলে আইনি বাধ্যবাধকতায় রাষ্ট্রীয় খরচে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ পান অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ।
আসামিপক্ষের আইনজীবী তাঁর যুক্তিতর্কে বলেন:
প্রধান আসামির যাবজ্জীবন: প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজেই আদালতের কাছে নিজের দোষ স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন। তাছাড়া ঘটনার সময় তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং ঘটনার কাজে ব্যবহৃত ছুরির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি। এই মানবিক দিকগুলো বিবেচনা করে তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
সহযোগীর ৭ বছরের সাজা: অন্য আসামি ও সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে মূলত লাশ গুমে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী তার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের আবেদন করা হয়েছে।
সাফাই সাক্ষ্যের অনুপস্থিতি: আসামিপক্ষ নিজেদের সমর্থনে আদালতে কোনো সাফাই সাক্ষী বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেনি।
১৯ মে, ২০২৫: পল্লবীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
২০ মে, ২০২৫: নিহতের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করা হয়।
২৪ মে, ২০২৫: ডিএনএ, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়।
২ জুন, ২০২৬: নিহত শিশুর বাবা-মা, প্রতিবেশী এবং ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে রামিসার বড় বোনসহ মোট ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মঙ্গলবার মামলার সাক্ষ্যদান পর্ব সমাপ্ত হয়।
আট বছরের অবুঝ শিশু রামিসা আক্তারের সাথে যে পাশবিকতা ও নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তা পুরো মানবতাকে লজ্জিত করে। ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী যথার্থই বলেছেন যে, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রক্রিয়া হতে যাচ্ছে। দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ আশা করে, আগামীকাল ট্রাইব্যুনালের রায়ে অপরাধীদের এমন কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে, যা ভবিষ্যতে এই ধরণের পৈশাচিক অপরাধের পুনরাবৃত্তি রুখতে ঢাল হিসেবে কাজ করবে। দেশবাসী এখন আদালতের সেই ঐতিহাসিক রায়ের অপেক্ষায়।
আদালত প্রতিবেদক