ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

বেসরকারী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও কিছু কথা।

বেসরকারী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও কিছু কথা। ছবি: সংগৃহীত
ad728
আমাদের একটা দেশ, কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কলেজ পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থা আবার দুই রকম। সরকারী কলেজ এবং বেসরকারী কলেজ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বেসরকারী কলেজের অবদান প্রায় সাতানব্বইভাগ। এর মানে দেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার উন্নতি নির্ভর করে বেসরকারী কলেজের ওপর। হাতে গোনা কয়েকটি সরকারী কলেজে সীমিত শিক্ষার্থীই অংশ গ্রহণের সুযোগ পায়। আর সিংহভাগকেই নির্ভর করতে হয় বেসরকারী কলেজের ওপর। তাই বেসরকারী কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থা জোরদার ও যুগোপযোগী করতে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদান কার্যক্রমও যুগোপযোগী করার কোন বিকল্প নেই। 

পরিতাপের বিষয় এই যে, একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কোন উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বেসরকারী কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থায়। যুগের সাথে তাল মেলাতে অক্ষম ঢিমেতালে চলা বেসরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা বেশ নাজুক হয়ে পড়ছে দিন দিন। সম্প্রতি অবকাঠামোগত উন্নতি লক্ষ্য করা গেলেও শিক্ষার কাঠামোগত কোন উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষকের  পাঠদানে শিক্ষার্থীরা সন্তোষ্ট হতে পারছে না। 
বর্হিবিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলাতো দুরের কথা। এর বহু কারণ বিদ্যমান। তার মধ্যে বিশেষ করে বেসরকারী কলেজ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বৈষম্য। বহুদিক দিয়েই বেসরকারী কলেজ শিক্ষকরা আজ বৈষম্যের শিকার। বেসরকারী কলেজ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রটিতে কিভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে সেটিই আলোকপাত করা যাক। 
অতি আশ্চর্য্য এবং অতীব পরিতাপের বিষয় এই যে, বেসরকারী কলেজ শিক্ষদের কোন বুনিয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। পূর্বের কথা বাদ দিলেও বলা যায় বর্তমানে সরকার কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা আছে। 
অর্থ্যাৎ এনটিআরসিএ এখন শিক্ষক নিয়োগ দেয়। কিন্তু নিয়োগের পর থেকে বছরের পর বছর চলে যায় কিন্তু প্রশিক্ষণের কোন ডাক আসে না। 

যেকোন পেশাজীবিদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারী কলেজ শিক্ষকদের ভাগ্যে তা জোটে না। নূণ্যতম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও তা রীতিমতো হাস্যকর। সে অবস্থায় কেউ প্রশিক্ষণে আগ্রহ পায় না। বাংলাদেশের শিক্ষা গবেষণা কেন্দ্র নায়েমে সরকারী কলেজ শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের জন্য বিশাল কর্মযজ্ঞ দেখা গেলেও নেই বেসরকারী শিক্ষকদের কোন ব্যবস্থা। শুধুমাত্র ইংরেজি এবং আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও অন্য কোন বিষয়ে তার কোন নাম গন্ধ নেই। তবে এখানে বেসরকারী কলেজ অধ্যক্ষদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও তা নামকাওয়াস্তে। এখানে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অফিসিয়াল প্রশিক্ষণ নিয়মিতই অনুষ্ঠিত হয়।

ময়মনসিংহে অবস্থিত উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিউটের অবস্থা আরো নাজকু। 
এখানে এলে মনে হয় শিক্ষক সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ এখানো প্রাচীন বাংলার শাসক শায়েস্তা খানকে অনুসরণ করছেন। সম্মানীর পরিমান শুনলে যেকেউ এতো অবাক হবেন যে তার মুখ দিয়ে কথাই বের হবে না। অথচ কোন পরিবর্তন নেই। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে হয়তো কখনো উন্নতির সম্ভাবনাও নেই। আবাসিক এই প্রতিষ্ঠানটির থাকার ব্যবস্থাও তেমন ভালো নয়। ডাইনিংয়ের খাওয়া-দাওয়ার অবস্থা তথৈবচ। দেখাশোনা করার লোক নেই। যেন হাওয়ার ওপরে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। ব্যাপারটি কর্তৃপক্ষের নজরে নেই অথবা তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা এখনো অনড় অবস্থা ধরে রেখেছেন। কারণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রশিক্ষণার্থীদের দেয় সম্মানীর পরিমান এতো অল্প যে তা কোথাও উল্লেখ করতে গেলেও লজ্জা পেতে হয়। চল্লিশ দিবসের এই প্রশিক্ষণের পরে কোন ফলোয়াপ প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থাও নেই। এই অবস্থার মধ্যেও অনেক উৎসাহী এবং নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকগণ নিজ গরজেই এই প্রতিকূল অবস্থার প্রশিক্ষণ নিতে আসেন। এসব হাস্যকর অবাস্তব অবস্থা বজায় রেখে আর যাই হোক শিক্ষার কাঙ্খিত উন্নতি হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। 
বেসরকারী কলের্জে একজন শিক্ষকের নিয়োগের পর থেকে এক যুগ পেরিয়ে যায় তার বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণে ডাক পেতে। 

আবার বহু শিক্ষকই আছেন কোন ধরণের প্রশিক্ষণ ছাড়াই তার শিক্ষকতার জীবন সমাপ্ত হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীরা আরো বঞ্চিত হয় সঠিক শিক্ষা দান থেকে। হেলাফেলা মার্কা এই ধরণের প্রশিক্ষণ শিক্ষকদের টানে না। তাই অনেকেই তা প্রত্যাখান করে। ক্ষেত্রবিশেষে পারলে এড়িয়ে যায়। ফলে বেসরকারী কলেজে শিক্ষা প্রদান কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে। শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের ভাষণে কোন আকর্ষণ খুঁজে পায় না। অন্যান্য পেশাজীবিদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আর্থিক দিক থেকে যেমন সম্মানজনক তেমনি পদ্ধগিতভাবে উন্নত। তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হয়। বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ এবং বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষন ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থা কিছুতেই সমৃদ্ধ হতে পারে না। তাই এখনই করণীয় ঠিক করতে হবে। বেসরকারী শিক্ষকদের সাথে এই বৈষম্যের চির অবসান ঘটাতে হবে। বর্তমানে যেহেতু এনটিআরসি শিক্ষক নিয়োগ দেয় সেহেতু এখান থেকেই শুরু করতে হবে। নিয়োগের এক বৎসরের মধ্যে বুনিয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়োগের দুই বছরের মধ্যে হতে হবে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ। 

বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের মেয়াদ হতে হবে কমপক্ষে দেড়মাস। বিদ্যালয় শিক্ষকদের বিএড কোর্সের মতো কলেজ শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক একবছরের এমএড কোর্স চালু করা যেতে পারে। এই কোর্স করা থাকলে তার জন্য আলাদা ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অথবা চাকুরিতে যোগদানের চারবছরের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে এমএড কোর্স করে নিতে হবে। এই বিশেষ এমএড কোর্সটা শুধু কলেজ শিক্ষকদের উপযোগী করে সাজাতে হবে। কোন শিক্ষক যাতে এসব প্রশিক্ষন এড়িয়ে যেতে না পারেন সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। 
আধুনিক শিক্ষাজগতের সাথে মিল রেখে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশের সকল বেসরকারী কলেজ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষন কলেজ। নামে মাত্র কয়েকটি কলেজ দিয়ে এই চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই কলেজ শিক্ষকদের যুগের পর যুগ অপেক্ষা করতে হয় একটি প্রশিক্ষণে ডাক পেতে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। 

কাংখিত শিক্ষার মান ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হয়। তাই শিক্ষক অনুপাতে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নিমার্ণ করতে হবে। সেখানে দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। বেসরকারী কলেজের সেরা প্রশিক্ষনার্থীদের এখানে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশিক্ষণ ভাতার সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। সরকারী পর্যায়ে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নজর দিতে হবে ইনহাউজ প্রশিক্ষণের দিকে। ইনহাউজ প্রশিক্ষণ যদিও ছোট পর্যায়ের একটি প্রশিক্ষন তথাপি এটাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি দুই বছর বা তিনবছর অন্তর অন্তর এই ইনহাউজ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। 

মনে রাখতে হবে প্রশিক্ষণ একজন শিক্ষককে যুগোপযোগী করে তৈরি করে। শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন ধরণের ঘাটতি দুর করে। একজন দক্ষ শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলে। আর একজন দক্ষ শিক্ষকই পারেন শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি দুর করতে। তাদেও জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে। বেসরকারী কলেজ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ ও মান বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবী।