মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তারা যদি কোনো ‘গ্রহণযোগ্য’ চুক্তিতে না আসে, তবে যেকোনো মুহূর্তে দেশটির ওপর বড় ধরনের পূর্ণাঙ্গ সামরিক হামলা চালানো হবে। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর এক পোস্টে তিনি এই কড়া বার্তা দেন।
স্থানীয় সময় সোমবার (১৮ মে) ট্রাম্প জানান, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর নির্ধারিত একটি সামরিক হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ওয়াশিংটনে একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পাঠানোর পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে ট্রাম্পের মতে, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেজন্য তাদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর এখন ‘খুব ভালো সম্ভাবনা’ তৈরি হয়েছে। খবর আল জাজিরার।
যুদ্ধবিরতির মাঝে নতুন উত্তেজনা:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ছয় সপ্তাহ পর, গত ৮ এপ্রিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। এরপর থেকে সংঘাত অনেকটাই কমে আসলেও স্থায়ী শান্তি চুক্তি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। এর মধ্যেই সোমবার সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা তিনটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এর আগের দিনই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা হয়েছিল। শান্তি আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার মাঝেই এই ড্রোন হামলাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
হামলা স্থগিত নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য:
ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের অনুরোধে তিনি মঙ্গলবারের নির্ধারিত হামলাটি স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে হাই-অ্যালার্টে রেখে বলা হয়েছে, চুক্তি সফল না হলে যেকোনো মুহূর্তে যেন পূর্ণাঙ্গ হামলা চালানো হয়।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের ১৪ দফা পরিকল্পনা:
যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সংশোধিত ১৪ দফার শান্তি পরিকল্পনা জমা দিয়েছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইরানের মূল দাবি: বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ফেরত দেওয়া, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া, মার্কিন নৌ-অবরোধের অবসান এবং লেবাননসহ সব জায়গায় যুদ্ধ বন্ধ করা।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবি: ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের প্রধান ৩টি কারণ:
| বিরোধের মূল বিষয় | যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান | ইরানের অবস্থান | |
| ১ | ইউরেনিয়ামের মজুত | ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরির কাঁচামাল (সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম) হস্তান্তর করতে হবে। | সরাসরি দিতে রাজি নয়, তবে রাশিয়ার কাছে জমা রাখার প্রস্তাব বিবেচনা করছে। |
| ২ | হরমুজ প্রণালি ও তেল | আন্তর্জাতিক এই জলপথে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে। মার্কিন নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। | গত মার্চ থেকে এই রুটে জাহাজ চলাচলে ট্যাক্স/টোল বসাতে চায় ও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। |
| ৩ | আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী | ইয়েমেনের হুথি ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি গোষ্ঠীর ওপর নিষেধাজ্ঞা চায়। | এই বিষয়টি আলোচনার পরবর্তী ধাপের জন্য তুলে রেখেছে। |
মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোতেও। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই কূটনৈতিক দড়িটানাটানি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয় নাকি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক