ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

ফিলিপিন্সে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫

ফিলিপিন্সে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫ ছবি - সংগ্রহীত
ad728
ফিলিপাইনে সাম্প্রতিক সময়ের সবচে বড় ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছে।
দক্ষিণ ফিলিপিন্সের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল মিন্দানাও দ্বীপে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৮ মাত্রার এক অতি শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে আরও অন্তত ১৩৪ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষের নিচে এখনো অনেকে চাপা পড়ে থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত সোমবার (৮ জুন) স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে মিন্দানাও দ্বীপে এই শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়। ফিলিপিন্সের সিভিল ডিফেন্স অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্র ছিল জেনারেল স্যান্টোস সিটির উপকূলের কাছাকাছি এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। উৎপত্তিস্থল কম গভীরে হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতা অনেক বেশি হয়েছে।

সুনামি সতর্কতা ও উপচে পড়া পরাঘাত (Aftershocks)
ভূমিকম্পের পরপরই ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া এবং জাপানসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশজুড়ে তীব্র সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে কয়েক ঘণ্টা সমুদ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পর বড় ধরনের কোনো জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা না থাকায় সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

মিন্দানাও ফিলিপিন্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং অন্যতম প্রধান জনবহুল দ্বীপ, যেখানে প্রায় ২৬ মিলিয়ন (২ কোটি ৬০ লাখ) মানুষের বসবাস। স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ১১টা পর্যন্ত ওই অঞ্চলে মূল ভূমিকম্পের পর আরও অন্তত ১৩৮টি পরাঘাত বা আফটারশক অনুভূত হয়েছে। রিখটার স্কেলে এই পরাঘাতগুলোর মাত্রা ছিল ১ দশমিক ৩ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৭ পর্যন্ত, যা উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মীদের এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

ধসে পড়েছে বাণিজ্যিক ভবন, বাস্তুচ্যুত ১০ হাজার মানুষ
জেনারেল স্যান্টোস সিটির স্থানীয় তথ্য কার্যালয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে ওই অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র ফুটে উঠেছে। শত শত বাড়িঘর ও রেস্তোরাঁ ভেঙে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বেশ কিছু বড় বড় দোকানপাট ধসে পড়েছে এবং একটি বিশাল বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সের বাইরের কংক্রিটের শক্তিশালী দেয়াল ভেঙে স্তূপ আকারে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
ভূমিকম্পের তীব্রতায় কিছু কিছু এলাকায় বড় ধরনের ভূমিধসও রেকর্ড করা হয়েছে। ফিলিপিন্সের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, এই দুর্যোগের কারণে ইতিমধ্যে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। মূলত ভবনের ধ্বংসাবশেষ চাপা পড়ে এবং পাহাড় ধসের কারণেই বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

সিভিল ডিফেন্স অফিস সোমবার বিকেলে নিহতের সংখ্যার সর্বশেষ হালনাগাদ জানিয়ে বলেছে, মিন্দানাওয়ের ‘সক্সসারজেন’ (Soccsksargen) অঞ্চলে ৩১ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে এবং ‘দাভাও’ (Davao) অঞ্চলে মারা গেছেন ৪ জন।

ফিলিপিন্সের সরকারি স্কুলগুলোতে সবেমাত্র নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হওয়ার ঠিক মুখেই এই বিপর্যয় নেমে এলো। দাভাও অঞ্চলের একটি প্রাথমিক স্কুলের ভিডিওতে দেখা যায়, সকালের প্রাত্যহিক সমাবেশ ও পতাকা উত্তোলনের সময় হঠাৎ চারপাশ কেঁপে উঠলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা চরম আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চারদিকে ছুটোছুটি করছে।

উদ্ভূত ভয়াবহ পরিস্থিতি বিবেচনা করে ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়র ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দুর্গম এলাকায় দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করার এবং স্থানীয় গৃহহীন বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য কর্মকর্তা দিয়েগো মারিয়ানো জনসাধারণকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যেসব বাড়িঘর বা বহুতল ভবন ভূমিকম্পে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বা ফাটল ধরেছে, সেগুলোতে যেন বাসিন্দারা এখনই প্রবেশ না করেন। কারণ অনবরত হতে থাকা পরাঘাতের কারণে সেগুলো যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই ফিলিপিন্সকে পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটি মূলত প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ (Ring of Fire)-এর ওপর অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অববাহিকা ঘিরে থাকা এই সক্রিয় ফল্টলাইনের কারণে দেশটিতে ঘন ঘন শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে থাকে।

প্রসঙ্গ উল্লেখ্য, গত বছরও ফিলিপিন্সে বিগত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। সে সময় দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় সেবু দ্বীপে রিখটার স্কেলে শক্তিশালী কম্পনের ফলে ৭০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে মানুষের তৈরি কংক্রিটের দেয়াল যে কতটা ভঙ্গুর, মিন্দানাও দ্বীপের এই ভয়াবহ চিত্র তা আরও একবার মনে করিয়ে দিল। তবে রিং অব ফায়ারে অবস্থিত ফিলিপিন্সের উদ্ধারকারী দলগুলোর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পূর্বপ্রস্তুতি প্রশংসনীয়। নিখোঁজ মানুষদের দ্রুত উদ্ধার এবং বাস্তুচ্যুত ১০ হাজার মানুষের পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা উচিত।

সর্বশেষ সংবাদ
সিদ্ধিরগঞ্জে ডিএনডি লেকে ডুবে দুই মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু

সিদ্ধিরগঞ্জে ডিএনডি লেকে ডুবে দুই মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু