ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

আত্মীয়ের সাথে বিয়ে হলে হতে পারে যে ভয়ানক সর্বনাশ!

আত্মীয়ের সাথে বিয়ে হলে হতে পারে যে ভয়ানক সর্বনাশ! ছবি সংগৃহীত
ad728
নিজেদের কাছের আত্মীয়ের সাথে বিয়ের আয়োজন করছেন? কিন্তু এটা আপনার ভবিষ্যত প্রজন্ম ও আপনার জন্য কতটা উপযোগী, তা জানেন? 
আজকাল সমাজে একটা কথা বেশ প্রচলিত, কথাটা হচ্ছে- ‘ঘরের মেয়ে ঘরেই থাকুক’ 
পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় রাখার ভাবনা থেকে চাচাতো, খালাতো, মামাতো বা ফুফাতো ভাইবোনের (কাজিন) মধ্যে বিয়ের প্রচলন বিশ্বের বহু সমাজেই বেশ জনপ্রিয়। আপাতদৃষ্টিতে এই পারিবারিক বিয়েগুলোকে নিরাপদ মনে হলেও, দীর্ঘ ১৮ বছরের একটি গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং উদ্বেগজনক এক সত্য সামনে এনেছে। গবেষকরা বলছেন, এমন রক্তসম্পর্কীয় বিয়ের ফলে ভবিষ্যৎ সন্তানের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জন্মগত ত্রুটির সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যায়।


যুক্তরাজ্যের (ব্রিটেন) ব্র্যাডফোর্ড শহরে পরিচালিত ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ নামক একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ১৩ হাজারেরও বেশি শিশুকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই গবেষণার প্রধান প্রধান তথ্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
গবেষকরা স্পষ্ট দেখেছেন যে, সাধারণ দম্পতির তুলনায় রক্তসম্পর্কিত বা আপন কাজিনদের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে বংশগত বা জন্মগত রোগের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ।
সাধারণ ক্ষেত্রে শিশুদের মধ্যে বংশগত ত্রুটি বা রোগের ঝুঁকি যেখানে মাত্র ৩ শতাংশ, সেখানে চাচাতো, খালাতো বা মামাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি একলাফে বেড়ে প্রায় ৬ শতাংশে গিয়ে পৌঁছায়।

এই গবেষণার আওতায় থাকা শিশুদের মধ্যে শুধু শারীরিক জটিলতাই নয়, বরং দেরিতে কথা বলতে শেখা (Speech Delay), ভাষাগত সমস্যা, সামগ্রিক বিকাশজনিত ঘাটতি (Developmental Delay) এবং ঘন ঘন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি দেখা গেছে।


গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক জন রাইট এবং সহ-গবেষক নীল স্মল এই ঝুঁকির বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের মতে:
“যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পরিবারের বা গোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ের সিলসিলা চলতে থাকে, তখন মানবদেহের কিছু সুপ্ত ত্রুটিপূর্ণ জিন (Recessive Defective Genes) খুব সহজেই একত্রিত হওয়ার সুযোগ পায়। মা ও বাবা উভয়েরই বংশধারা এক হওয়ায় এই ত্রুটিপূর্ণ জিনগুলো সন্তানের শরীরে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে শিশুর হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি কিংবা শরীরের অন্যান্য প্রধান প্রধান অঙ্গের জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি ত্রুটি দেখা দিতে পারে।”

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, সমস্যার মূল কারণ শুধু একক কোনো চাচাতো বা খালাতো বিয়ে নয়, বরং একই নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা আত্মীয়দের সার্কেলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অন্ধ প্রবণতা।


এই মারাত্মক জিনগত স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও এখন আইনি ও সামাজিক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে:
নরওয়ে ইতিমধ্যেই আপন চাচাতো-খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সুইডেনও একই ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথে হাঁটছে।

তবে ইতিবাচক দিক হলো, বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে কাজিনদের মধ্যে বিয়ের হার দিন দিন কমছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের দিকে যেখানে এই ধরনের বিয়ের হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ, বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যার সমাধান কেবল কঠোর আইন করে সম্ভব নয়; বরং সচেতনতা এবং শিক্ষাই এর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। একটি সুস্থ, রোগমুক্ত ও সবল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া অত্যন্ত জরুরি:

১. প্রাক-বৈবাহিক জিনগত পরামর্শ (Genetic Counseling): 
বিয়ের আগে বিশেষ করে আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে হলে থ্যালাসেমিয়াসহ অন্যান্য জিনগত রোগ নির্ণয়ে জিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।

২. প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা: 
রক্তসম্পর্কীয় ভাইবোনের মধ্যে বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে উভয়ের রক্তের প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং টেস্ট ও স্ক্রিনিং করানো।
পারিবারিক আবেগ বা সম্পত্তি ধরে রাখার মানসিকতার চেয়ে একটি অনাগত শিশুর সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। কাজিনদের মধ্যে বিয়ে মানেই যে সন্তান অসুস্থ হবে-এমনটি নিশ্চিত নয়, তবে বিজ্ঞানের দেখানো দ্বিগুণ ঝুঁকির বিষয়টিকে অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই বিবাহপূর্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে যত দ্রুত চালু হবে, ততই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুরক্ষিত থাকবে।

সর্বশেষ সংবাদ
শিগগিরই চালু হচ্ছে ভারতীয় ভিসা: স্বাভাবিক হচ্ছে দুই দেশের সে

শিগগিরই চালু হচ্ছে ভারতীয় ভিসা: স্বাভাবিক হচ্ছে দুই দেশের সে