
ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া (পুশইন) ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু গত ৬২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিনরাত পার করছেন।
শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) আটকে থাকা এই মানুষগুলো চরম মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এই সংকট নিরসনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের মধ্যে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো পক্ষই ওই ব্যক্তিদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণে রাজি হয়নি। উপরন্তু, আজ রোববার (৭ জুন) দুপুরে বিএসএফ পুনরায় তাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবির তীব্র প্রতিরোধে সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সীমান্তের ওই এলাকায় উভয় বাহিনী অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আজ দুপুরে দক্ষিণ প্রধানপাড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় জমির একটি আইলে (উঁচু স্থান) পাঁচজন পুরুষ, দুইজন নারী এবং তিনটি শিশু অত্যন্ত নিরুপায় হয়ে বসে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র রোদ, আকস্মিক বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে অবস্থান করলেও তাদের মাথার ওপর কোনো ছাউনি নেই। আর তাদের দুপাশে ভারী অস্ত্র হাতে সতর্ক পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে দুই দেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত শুক্রবার (৫ জুন) ভোর থেকে মানুষগুলো ওই কর্দমাক্ত জমিতে অবস্থান করছেন। শুক্রবার রাতে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও তারা একই স্থানে ভিজতে বাধ্য হয়েছেন।
খাবার ও পানির সংকট: দীর্ঘ তিন দিন ধরে আটকে থাকায় তাদের সঙ্গে থাকা বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনা খাবার সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে তারা হয়ত জমিতে জমে থাকা দূষিত জল পান করছেন।
সীমান্তের এই অমানবিক দৃশ্য দেখে প্রতিদিন দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন স্থানীয় উৎসুক বাসিন্দারা। ১০ জন মানুষের কাছে সরাসরি যাওয়ার অনুমতি না থাকলেও দূর থেকেই তাদের এই চরম দুর্ভোগ দেখে ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলছিলেন, “তিন দিন ধরে এই অবুঝ শিশু আর নারীদের কষ্ট দেখে খুব খারাপ লাগছে। আমরা নিজেদের উদ্যোগে তাদের সাহায্য বা খাবার দিতে চাই, কিন্তু সীমান্ত পরিস্থিতির কড়াকড়ির কারণে সবসময় তা সম্ভব হয় না। মানুষগুলো এভাবে খোলা আকাশের নিচে কতদিন থাকবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।”
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক আজিজুল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, “এদের মধ্যে কেউ যদি এভাবে না খেয়ে বা অসুস্থ হয়ে মারা যায়, তবে তার দায় কে বা কোন দেশের সরকার বহন করবে? মানবতার জন্য যদি আন্তর্জাতিক আইন তৈরি হয়, তবে আজ এই মানুষগুলোর ক্ষেত্রে এমন আচরণ কেন করা হচ্ছে?”
হাড়িভাসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইয়েদ নুরে আলম বলেন, “মানুষকে এভাবে সীমান্তে ফেলে রাখা কোনোভাবেই মানবিক রাষ্ট্রাচার হতে পারে না। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে তারা চরম দুর্ভোগে আছেন। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের দ্রুত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির স্থায়ী সমাধান করা উচিত।”
বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, এই ১০ জন মানুষকে বাংলাদেশে পুশইনের ঘটনার পর থেকে বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একাধিকবার পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। গতকাল শনিবার দুপুরে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে প্রায় ২০ মিনিটের একটি জরুরি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও উভয় পক্ষ কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
৫৬-বিজিবি নীলফামারী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বৈঠকের বিষয়ে জানান:
“আমরা ভারতের ৯৩ বিএসএফের কমান্ডারের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ওই ব্যক্তিদের দ্রুত ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত নেওয়ার জোরালো অনুরোধ জানিয়েছি। তবে বিএসএফ আমাদের সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। আমরা তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, ভারত যদি কাউকে বাংলাদেশে পাঠাতে চায়, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও নির্ধারিত দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের (ICP) মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পাঠাতে হবে। এভাবে জোরপূর্বক পুশইন করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং বিজিবি তা মেনে নেবে না।”
আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবাধিকার সনদের তোয়াক্কা না করে বিএসএফ যেভাবে প্রায়ই পুশইনের অপচেষ্টা চালায়, তা প্রতিবেশী সুলভ আচরণের পরিপন্থী। বিশেষ করে ৫টি পুরুষ মানুষের পাশাপাশি ২টি নারী ও ৩টি নিষ্পাপ শিশুকে যেভাবে গত তিন দিন ধরে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে খা-খা মাঠের আইলে বন্দি করে রাখা হয়েছে, তা চরম অমানবিক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে অনতিবিলম্বে দিল্লির কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ করে এই জিম্মি দশার অবসান ঘটানো এবং বিজিবির সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান ধরে