
বিচারপতির ওই অপমানজনক তুলনা ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের মধ্যে এক বিশাল ও নজিরবিহীন ক্ষোভের জন্ম দেয়। ফলশ্রুতিতে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ১২ বছরের শাসনামলে অনলাইনে এটিই হয়ে উঠেছে তরুণদের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদগুলোর অন্যতম। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক উন্মুক্ত শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশের বেকার তরুণ সমাজকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের এই বিতর্কিত মন্তব্য যে ভারতের রাজনীতির খোলনলচে নাড়িয়ে দেবে, তা হয়তো তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি।
🪳 ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) কী এবং এর মূল দর্শন?
বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যের পর, আম আদমি পার্টির (এএপি) সাবেক সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে এই ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ শব্দটিকে প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ারে রূপান্তর করেন। ক্ষমতাসীন দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (বিজেপি)-এর নামের সঙ্গে ব্যঙ্গ করে তিনি গত ১৬ মে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি প্রতীকী ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন, যা নিমেষেই ভাইরাল হয়।
মাত্র ২ দিনের মধ্যে এই প্রতীকী দলে ৪০ হাজার সদস্য যুক্ত হন এবং ৫ দিনের মধ্যেই অনলাইন অনুসারীর সংখ্যা লাখ লাখ ছাড়িয়ে মূল ধারার গণমাধ্যমের নজর কাড়ে।
তেলাপোকার মতো চরম প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার ক্ষমতা ও অদম্য জীবনীশক্তিকে ভারতের অবহেলিত তরুণদের জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরেছে দলটি। সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা আনা।
‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দলটির প্রতিষ্ঠাতা দিপকে বলেন, “রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে আমরা কেবলই ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ। আমরা তুচ্ছ, সহজেই অবহেলা করা যায় এবং পুরোপুরি আবর্জনার মতো। কিন্তু তেলাপোকা সব পরিবেশেই টিকে থাকে। আপনারা আমাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু একেবারে মুছে ফেলতে পারবেন না।”
এই দল এখন আর শুধু ইন্টারনেট বা ভার্চুয়াল জগতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের জীবন ছেড়ে সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে গত শনিবার (৬ জুন) যখন দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখেন, তখন তাঁকে স্বাগত জানাতে এবং রাজপথ কাঁপাতে ঐতিহাসিক বিক্ষোভস্থল যন্তরমন্তরে হাজার হাজার তরুণের সমাগম ঘটে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তোলার পর এটিই ছিল ‘ককরোচ পার্টি’র প্রথম সরাসরি রাজপথের কর্মসূচি, যেখানে শত শত তরুণ হাতে প্ল্যাকার্ড ও তেলাপোকার প্রতীক নিয়ে মিছিলে জড়ো হন। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে নয়াদিল্লির মানমন্দির যন্তর মন্তরে এই বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। মূলত সাম্প্রতিক নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার চরম কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে এই আন্দোলন ডাকা হয়। রাজপথে মিছিল করার সময় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন— “তেলাপোকারা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছে।”
ভারতে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী তীব্র প্রতিযোগিতামূলক সরকারি পরীক্ষাগুলোতে অংশ নেন উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরি পেতে। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, নম্বর দেওয়ায় ভুল ও কারিগরি ত্রুটি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যেটিকে তারা প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা হিসেবে দেখছেন। ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হওয়ার পরও তরুণরা বলছেন, তাদের প্রত্যাশামতো সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের এই ফারাক স্পষ্ট:
বেকারত্বের সরকারি তথ্য: সরকারি তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত বছর ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ।
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকার ভারতীয়দের মধ্যে ৬৭ শতাংশই স্নাতক (গ্র্যাজুয়েট) পাস। আর এই বেকার, অলস ও চিরসত্যবাদীদের প্রতিনিধিত্বই করছে সিজেপি।
ককরোচ পার্টির এই আকস্মিক উত্থান নরেন্দ্র মোদীর জন্য এক গভীর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশেরই বয়স ৩৫ বছরের নিচে। অথচ ভারতের নীতি নির্ধারক ও শীর্ষ নেতাদের গড় বয়স ৬০ থেকে ৭০-এর কোঠায়, যেখানে খোদ প্রধানমন্ত্রী মোদীর বয়স ৭৫ বছর। প্রবীণ নেতাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও বংশানুক্রমিক রাজনীতির কারণে তরুণরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।
তরুণ ভোটারদের এই পরিবর্তনের হাওয়া সম্প্রতি তামিলনাড়ু রাজ্যের মে মাসের বিধানসভা নির্বাচনে দেখা গেছে, যেখানে তরুণদের ভোটেই দশকের পর দশকের শাসনের ধারা ভেঙে সবাইকে তাক লাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন চলচ্চিত্র তারকা বিজয় থালাপতি। যদিও সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের শাসনকে হটিয়ে ক্ষমতা নিয়ে মোদীর দল বিজেপি দেশের দুই-তৃতীয়াংশের ক্ষমতাই নিজেদের ও মিত্রদের হাতে রেখেছে। এমনকি গত মার্চে প্রকাশিত ‘মর্নিং কনসাল্ট’-এর জরিপে মোদীর ৬৮ শতাংশ জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল।
তারপরও, ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এবং ‘ব্লুমберг’ এর বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে— এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর সোচ্চার হওয়া মোদীর দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি (Gen-Z) আন্দোলনের যে জোয়ার দেখা গেছে, তার সাথে সিজেপি-র তুলনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এবং নেপালে তরুণ প্রজন্মের সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক আন্দোলন যেভাবে রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়ে সরকার পতন ঘটিয়েছিল, সিজেপি-র উত্থানকে অনেকেই সেই কাতারে ফেলছেন, যদিও সিজেপি সম্পূর্ণ অহিংস আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি অহংকারী মন্তব্য যেভাবে খোদ দিল্লির ক্ষমতা কাঠামোকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো ‘তেলাপোকা আন্দোলনে’ রূপ নিল, তা যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশের শাসকদের জন্য এক বড় শিক্ষা। তরুণদের বেকারত্ব ও ক্যারিয়ার নিয়ে উপহাস করার ফল কখনো শুভ হয় না। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শুরুতে ককরোচ পার্টিকে ‘অনলাইন স্টান্ট’ বলে উড়িয়ে দিলেও, দিল্লির রাজপথে এই তেলাপোকা জোয়ার ও মোদীর চেয়ে দ্বিগুণ অনলাইন ফলোয়ারের চাপ প্রমাণ করে যে, তরুণদের দাবিকে অবহেলা করে কোনো সরকারই শান্তিতে ঘুমাতে পারে না।