
নতুন করে বর্ডারে শুরু হয়েছে উত্তেজেনা।
বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তীব্র বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের একটি সীমান্তের বাসিন্দারা। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সীমান্ত নীতি এবং বিএসএফের বেড়া নির্মাণের প্রস্তাবিত নকশার কারণে একটি সম্পূর্ণ ভারতীয় গ্রাম দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে।
গত রোববার (৭ জুন) সকালে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার ‘লিংখং’ গ্রামে এই ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ ও ‘পিটিআই’ (PTI)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিংখং গ্রামটির ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ব্যতিক্রমী। এই গ্রামটি মূলত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের একেবারে শূন্য রেখার (No Man's Land) ওপর অবস্থিত। এখানে ভারতীয় নাগরিকদের বাড়িঘর থেকে বাংলাদেশের বাসিন্দাদের বাড়িঘরের দূরত্ব মাত্র কয়েক মিটার।
আন্তর্জাতিক কনভেনশন বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের স্থায়ী সীমান্ত বেড়া সাধারণত শূন্য রেখা থেকে দেশের অন্তত ১৫০ গজ ভেতরে নির্মাণ করতে হয়। গ্রামবাসীদের মূল ভীতি ও আপত্তির জায়গাটি এখানেই:
বিএসএফ যদি আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে শূন্য রেখা থেকে ১৫০ গজ ভেতরে ভারতের মূল ভূখণ্ডের অংশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়, তবে পুরো লিংখং গ্রামটি বেড়ার বাইরে অর্থাৎ কার্যত ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ পড়ে যাবে।
নিরাপত্তা ও যাতায়াত ঝুঁকি: এর ফলে গ্রামটি ভারতের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, যা গ্রামবাসীদের যাতায়াত, দৈনন্দিন নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করবে।
গ্রামপ্রধান রামু এই বিষয়ে সংবাদ সংস্থাকে বলেন, “আমরা সীমান্ত সুরক্ষিত করার বা বেড়া দেওয়ার বিরুদ্ধে নই। তবে আমাদের দাবি—বেড়াটি যেন কোনো নিয়ম শিথিল করে একেবারে শূন্য রেখাতেই নির্মাণ করা হয়, যাতে আমাদের গ্রামটি ভারতের ভেতরে এবং নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাভুক্ত এলাকার মধ্যেই সুরক্ষিত থাকে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, করোনাকালীন (কোভিড-১৯) সময়ে লিংখং গ্রামবাসীর তৈরি একটি সাধারণ বাঁশের বেড়া ছাড়া এই গ্রামটিকে বাংলাদেশ থেকে আলাদা করার মতো দৃশ্যমান আর কিছুই নেই। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চলে আসলেও সম্প্রতি বিএসএফ সেখানে স্থায়ী কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করতে গেলে গ্রামবাসীরা বাধা দেন।
রোববার বিক্ষোভ প্রদর্শনের পাশাপাশি গ্রামবাসী এই বেড়া নির্মাণের কাজ অবিলম্বে স্থগিত করার জোর দাবি জানিয়ে স্থানীয় পিনুরস্লার সাব-ডিভিশনাল অফিসারের (SDO) কাছে একটি আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন।
মেঘালয়ের সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সম্পূর্ণ সিল ও সুরক্ষিত করার অংশ হিসেবে এই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ বেশ জোরেশোরেই চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ৪৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার মধ্যে বিভিন্ন জটিল স্থানীয় সমস্যা এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে বর্তমানে মাত্র ৮০ কিলোমিটারেরও কম অংশ বেড়াবিহীন বা উন্মুক্ত অবস্থায় আছে।
বিএসএফের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লিংখং গ্রামের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও সার্বিক সহায়তা দিতে ইতোমধ্যে সেখানে একটি স্থায়ী সীমান্ত চৌকি (BOP) স্থাপন করা হয়েছে এবং বিএসএফ সদস্যরা বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, যেসব সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দিলে মানুষের বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে শূন্য রেখা বরাবর বিশেষ ‘সিঙ্গেল-রো’ (এক লাইনের) বেড়া নির্মাণের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালানো হয়েছে। তবে এই বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সম্মতি জানায়নি।
এদিকে, বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান বন্ধে ভারতের আরেক উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার সীমান্তগুলোতে সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ。
হিন্দুস্তান টাইমসের খবর অনুযায়ী, গত শুক্রবার বিএসএফের ত্রিপুরা ফ্রন্টিয়ার সদর দপ্তরে অমিত শাহের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়. উক্ত বৈঠকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা, মুখ্য সচিব জে কে সিনহা, ডিজিবি অনুরাগ ধানকরসহ আটটি সীমান্ত জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপাররা উপস্থিত ছিলেন.
এই নির্দেশনার আলোকে ত্রিপুরার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সব ক্যামেরা সরাসরি জেলা প্রশাসনের সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রের নতুন ‘সিসিটিভিভিত্তিক সীমান্ত নিরাপত্তা মডেল’ বাস্তবায়নকারী ভারতের প্রথম রাজ্য হতে যাচ্ছে ত্রিপুরা।
নতুন এই মডেলের অধীনে সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বিএসএফের পাশাপাশি বেসামরিক জেলা প্রশাসনও সরাসরি একসঙ্গে লাইভ মনিটরিংয়ের কাজ করবে। ত্রিপুরায় এটি সফল হলে পরবর্তীতে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত থাকা মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ অন্যান্য রাজ্যগুলোতেও এই সিসিটিভি ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করা হবে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুযায়ী ১৫০ গজ ভেতরে বেড়া দেওয়ার নিয়ম থাকলেও মানবিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে লিংখং গ্রামের বাসিন্দাদের দাবিটি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। নিজের দেশের নাগরিক হয়েও ভুল পরিকল্পনার কারণে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। অন্যদিকে, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ত্রিপুরা সীমান্তে বেসামরিক প্রশাসনকে যুক্ত করে ‘সিসিটিভি মডেল’ চালু করার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, ভারত এখন সীমান্ত নজরদারিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, যা বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনাতেও প্রভাব ফেলবে।