ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

জান্নাতি ঝরনা জমজমের অলৌকিক ও বরকতময় ইতিহাস

জান্নাতি ঝরনা জমজমের অলৌকিক ও বরকতময় ইতিহাস
ad728

মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশির মধ্যে এক অলৌকিক ও চিরন্তন ঝরনাধারা ‘জমজম’। এটি কেবল একটি পানির কূপ নয়, বরং মহান আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরত এবং জীবন্ত এক নিদর্শন। হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি তৃষ্ণার্ত মানুষের পিপাসা মিটিয়ে আসা এই কূপের পানি পবিত্রতা, বরকত এবং আরোগ্যের প্রতীক। বিশেষ করে, পবিত্র হজের মৌসুমে জমজম কূপের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশ্ব মুসলিম হৃদয়ে এক অনন্য আবেগ ও ঈমানি আবহ তৈরি করে।


ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগ:

খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ থেকে ১৯০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়কার কথা। ইতিহাসের বিভাজন অনুযায়ী সময়টি ব্রোঞ্জ যুগ হলেও ধর্মীয় ও সভ্যতার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল ‘পিতা-পিতামহদের যুগ’ (Age of the Patriarchs)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৭৭ মিটার উঁচুতে চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা জনমানবহীন, উত্তপ্ত এক মরুভূমিতে নিজের প্রিয় স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও দুগ্ধপোষ্য শিশুসন্তান ইসমাইল (আ.)-কে রেখে আল্লাহর আদেশে ফিরে যাচ্ছেন ইব্রাহিম (আ.)।

তিনি চলে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী হাজেরা (আ.) ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি কি আমাদের এভাবে ফেলে যাচ্ছেন?’ ইব্রাহিম (আ.) কোনো উত্তর দেননি। কিন্তু যখন বিবি হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহ কি আপনাকে এই আদেশ দিয়েছেন?’ তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ জবাবে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে হাজেরা (আ.) দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না।’



সাফা-মারওয়ার সাঈ এবং অলৌকিক ঝরনাধারা:

অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সঙ্গে থাকা সামান্য খাবার ও পানি শেষ হয়ে যায়। প্রখর রোদে তৃষ্ণায় অবুঝ শিশু ইসমাইল (আ.) মরুভূমির বালিতে ছটফট করতে থাকেন। সন্তানের এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পানির খোঁজে ব্যাকুল হয়ে ছোটেন মা হাজেরা।

  • মরীচিকা ও দৌড়াদৌড়ি: উত্তপ্ত মরুভূমির রোদে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে পানির মরীচিকা দেখে তিনি সাফা থেকে মারওয়া এবং মারওয়া থেকে সাফা—এভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন।

  • সবুজ বাতি ও সুন্নত: দুই পাহাড়ের মাঝখানের একটি নিচু জায়গা থেকে শিশু ইসমাইলকে দেখা যেত না বলে সেই অংশটুকু তিনি দ্রুত দৌড়ে পার হতেন। বিবি হাজেরার সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে স্মরণ করেই বর্তমানে পবিত্র হজ ও ওমরাহর সময় পুরুষদের জন্য এই স্থানে ‘সবুজ বাতি’ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানে দৌড়ানো ওয়াজিব/সুন্নত (সাঈ) করা হয়েছে।


‘জমজম’ শব্দের উৎপত্তি: সপ্তমবার যখন বিবি হাজেরা মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছান, তখন একটি অলৌকিক শব্দ শুনতে পান। সেখানে আল্লাহর নির্দেশে জিবরাইল (আ.) তার ডানা বা পায়ের গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাথুরে শক্ত বুক চিরে বেরিয়ে আসতে শুরু করে স্বচ্ছ জান্নাতি পানির ধারা। বিবি হাজেরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে পানির প্রবাহকে ধরে রাখতে চারপাশে বালু দিয়ে বাঁধ দিতে থাকেন এবং মুখে বলছিলেন—‘জমজম’ (থামো, থামো)। সেই থেকেই এই কূপের নাম হয় ‘জমজম’।


পবিত্র হজ ও জমজমের ওতপ্রোত সম্পর্ক:

পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতাগুলোর সঙ্গে জমজমের পানি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হজের প্রতিটি ধাপে যখন হাজিরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন জমজম তাদের ক্লান্তি দূর করে আত্মিক প্রশান্তি দান করে। কাবার চারদিকে তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দুই রাকাত নামাজ শেষে জমজমের পানি পান করা মোস্তাহাব ও অন্যতম নিয়ম।

জমজমের পানি পান করার বিশেষ দোয়া:

“আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআঁও, ওয়া রিজকান ওয়াসিআঁও, ওয়া শিফা-আম মিন কুল্লি দা-ইন।” অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সমস্ত রোগ থেকে আরোগ্য কামনা করছি।


রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী ও বৈজ্ঞানিক বিস্ময়:

জমজমের পানির মাহাত্ম্য ও অলৌকিকত্ব সম্পর্কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেছেন:

“জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে, তা-ই পূরণ হবে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)

হাজার হাজার বছর ধরে এই মরুভূমির বুক থেকে অবিরত প্রবাহিত এই জান্নাতি পানি কোটি কোটি মানুষের শুধু পিপাসাই মেটাচ্ছে না, বরং এতে রয়েছে এমন সব খনিজ উপাদান যা মানুষের শরীরের জন্য দারুণ পুষ্টিকর ও রোগ নিরাময়ক। হজের প্রতিটি মুহূর্তে জমজমের পানি হাজিদের হৃদয়ে ঈমানি শক্তি জোগায় এবং আল্লাহর কুদরতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

প্রখর মরুভূমির বুকে যেখানে কোনো পানির উৎস থাকার কথা নয়, সেখানে হাজার বছর ধরে কোটি কোটি লিটার পানি উত্তোলনের পরও জমজমের পানির স্তর এক ইঞ্চিও নিচে নামেনি। এটিই প্রমাণ করে, আল্লাহ তাআলার কুদরতি নেয়ামত কত চিরন্তন ও সত্য।


সর্বশেষ সংবাদ
বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের জন্য পশ্চিমবঙ্গে আটককেন্দ্র স্থাপ

বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের জন্য পশ্চিমবঙ্গে আটককেন্দ্র স্থাপ